গদ্য

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস - বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ

কাব্যকলি
  • ১৩-১২-২০২৫

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস - বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ

মুনীর চৌধুরি, শহীদুল্লাহ কায়সারের মত মেধাবী মানুষদের ওরা হত্যা করে। তারপর তাদের রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে ফেলে রাখে। এই তালিকায় নক্ষত্রপ্রতীম সব মানুষ ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক ডক্টর মুনীর চৌধুরী, ডাক্তার মোহাম্মদ ফজলে রাব্বী, ডাক্তার আলীম চৌধুরী, সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন, নিজাম উদ্দিন আহমেদ, আনম গোলাম মোস্তফা, সেলিনা পারভীন ড. জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ড. জিসি দেব, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আবুল খায়েরসহ আরও অনেকে। এদের মতো একেকজন মানুষ পেতে বাঙালিকে আরও হাজার বছর অপেক্ষা করতে হবে।

কাব্যকলি ডেস্ক- স্বাধীন দেশকে পিছিয়ে দেয়ার নীল নকশার নাম বুদ্ধিজীবী হত্যা। একটি জঘণ্য এবং পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র যা পৃথিবীর ইতিহাসেই বিরল। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদল জানতেন যে বুদ্ধিজীবীরা একটি দেশের প্রাণ। তাই তাঁদের শেষ করতে পারলেই যুদ্ধে পরাজয় হলেও মেরুদন্ড ভেঙে রাখা যাবে। ফলে সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশটিকে আবারও কূটনৈতিক কৌশলে গিলে রাখা যাবে। কারণ তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরাজয় সময়ের ব্যাপার মাত্র। খুব অল্প সময় রয়েছে এটাও পশ্চিম পাকিস্তানের থিংক ট্যাঙ্ক বুঝে গিয়েছিল। ভারত ও রাশিয়াকে পার করে এ যুদ্ধে জয়ী হওয়া অসম্ভব। তাছাড়া ঢাকা ছাড়া সারাদেশে পাক বাহিনীকে ঘিরে ফেলা হয়েছিল। সুতরাং বাকি ছিল আনুষ্ঠানিকতা। সেই শুভক্ষণের আগেই তালিকা ধরে চলে বুদ্ধিজীবী নিধন। এসব বুদ্ধিজীবীদের মাধ্যমেই দেশ সঠিক পথে অগ্রসর হয়। এটা সব জাতির জন্যই প্রযোজ্য। ১৪ই ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। বিজয়ের ঠিক দুই দিন আগে যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী পরাজয়ের নিশ্চিত শঙ্কায় কাঁপছিল আর বাঙালিরা বিজয়ের অপেক্ষায় ছিল। এর মধ্যেই এই জঘণ্য হত্যাকান্ড দেশবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির চুড়ান্ত বিজয়ের ঠিক আগে পাকিস্থান সেনাবাহিনী বুদ্ধিজীবী হত্যার মতো নতুন ঘৃণ্য একটি ষড়যন্ত্র করে। মূলত যখন তারা দেখলো সার্বিক পরিস্থিতি তাদের প্রতিকুলে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনভাবেই রোধ করা যাবে না, পাকিস্থানের তৎকালীন মিত্র রাষ্ট্রগুলোও যখন পাকিস্থানকে আর সাহায্য করতে পারছিল না তখনই তারা ঘৃণ্য এক ষড়যন্ত্র করে। তারা দেশের খ্যাতনামা মানুষদের তালিকা তৈরি করে হত্যা করতে আরম্ভ করে। এর প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল স্বাধীন দেশ মাথা তুলে দাড়াতে গেলে এইসব বুদ্ধিজীবিদের পরামর্শ এবং দিক নির্দেশনা একান্তভাবে প্রয়োজন হয়। ১৯৭১-এর ডিসেম্বরের শুরুতে যখন ভারত ও ভুটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় এবং মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে মিত্রবাহিনীও পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে; মূলত তখন থেকেই পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি বাহিনী বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা প্রণয়ন করে। ৪ ডিসেম্বর থেকে ঢাকায় নতুন করে আবার কারফিউ জারি করে পাকিস্তানি বাহিনী। 
১০ ডিসেম্বর থেকেই একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক বুদ্ধিজীবীকে হত্যার প্রস্তুতি নিতে থাকে এরা। ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাপরিকল্পনার মূল অংশটি বাস্তবায়ন করা হয়। শিক্ষাবিদ-সাহিত্যিক, সাংবাদিক-শিল্পী, চিকিৎসক-আইনজীবী ও প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পেশার বুদ্ধিজীবীদের পাকিস্তানি বাহিনীর দোসররা জোরপূর্বক অপহরণ করে নিয়ে যায়। ১৪ ডিসেম্বরেই প্রায় ২০০ জনের মতো বুদ্ধিজীবীকে নিজ বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় চোখে কাপড় বেঁধে। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, নাখালপাড়া ও রাজারবাগসহ অন্যান্য আরও অনেক জায়গার নির্যাতনকেন্দ্রে নিয়ে তাদের ওপর বীভৎস নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। পরে মিরপুর ও রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন বধ্যভূমিতে লাশ ফেলে দেয়।তাই আমাদের অগ্রগতিটা যেন শ্লথ হয় সে ব্যবস্থা তারা করতে চেয়েছিল। তারা নির্মমভাবে বেছে বেছে মেধাবী মানুষগুলোকে হত্যা করে। এই তালিকা তৈরিতেও পাকিস্থান বাহিনীকে সাহায্য করেছিল এদেশের রাজাকাররা। 
মুনীর চৌধুরি, শহীদুল্লাহ কায়সারের মত মেধাবী মানুষদের ওরা হত্যা করে। তারপর তাদের রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে ফেলে রাখে। এই তালিকায় নক্ষত্রপ্রতীম সব মানুষ ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক ডক্টর মুনীর চৌধুরী, ডাক্তার মোহাম্মদ ফজলে রাব্বী, ডাক্তার আলীম চৌধুরী, সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন, নিজাম উদ্দিন আহমেদ, আনম গোলাম মোস্তফা, সেলিনা পারভীন ড. জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ড. জিসি দেব, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আবুল খায়েরসহ আরও অনেকে। এদের মতো একেকজন মানুষ পেতে বাঙালিকে আরও হাজার বছর অপেক্ষা করতে হবে। শরীরে নিষ্ঠুর নির্যাতনের চিহ্নসহ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের লাশ পাওয়া যায় মিরপুর ও রায়েরবাজার এলাকায়। পরে তা বধ্যভূমি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। প্রায় অর্ধ শতক পর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির অংশ হিসেবে সরকার ২০২০ সালে প্রাথমিকভাবে এক হাজার ২২২ জনের একটি তালিকা করে। ১৯৭২ সালে জাতীয়ভাবে প্রকাশিত বুদ্ধিজীবী দিবসের সঙ্কলন, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও আন্তর্জাতিক নিউজ ম্যাগাজিন ‘নিউজ উইক’-এর সাংবাদিক নিকোলাস টমালিনের লেখা থেকে জানা যায়, শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা মোট ১ হাজার ৭০ জন। ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পরপরই নিকট-আত্মীয়রা মিরপুর ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে স্বজনের লাশ খুঁজে পায়। বুদ্ধিজীবীদের নিথর দেহজুড়েই ছিল আঘাতের চিহ্ন, চোখ, হাত-পা বাঁধা, কারও কারও শরীরে একাধিক গুলি, অনেককে হত্যা করা হয়েছিল ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে। লাশের ক্ষতচিহ্নের কারণে অনেকেই তাদের প্রিয়জনের মৃতদেহ শনাক্তও করতে পারেননি।

শেয়ার করুন:
কাব্যকলি

শব্দের ক্যানভাসে আঁকি অনন্তের ছবি...